রমজান-১
রমজানুল মুবারক!
গত রমজান থেকে আল্লাহ্‌ সুবহনাল্লাহতায়ালা আমাদেরকে এই রমজান পর্যন্ত হায়াত দারাজ করেছেন এর জন্য আল্লাহ্‌র দরবারে শুকরিয়া।
ডিজিটাল মিডিয়ার কল্যাণে আমরা রমজান সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারি। অনেক ভাই বোনেরা অনেক অনেক সুন্দর আল্লাহ্‌র কালাম, হাদিস ও আউলিয়ায়ে কেরামদের বাণী পোস্ট করেন সেখান থেকে আমরা জানতে ও শিখতে পারি।
সমস্যা হচ্ছে যত বেশী বেশী আনুষ্ঠানিকতা হচ্ছে, যত বেশী মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে, যত বেশী ওয়াজ ও বয়ান হচ্ছে, খুতবা হচ্ছ, যত বেশী শিক্ষিত হচ্ছি আমরা তত বেশী ধর্মীয় বিধান পালন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। নীতি নৈতিকতা মূল্যবোধ থেকে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।
সমাজে অন্যায় অনাচার বেড়েই চলছে। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের সাথে অপরাধ প্রবণতা যদি ‘লিনিয়ার’ হয় তাহলে তো ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ও শিক্ষা কম থাকাই ভালো!
আমার ক্ষুদ্র দৃষ্টিতে সমস্যাটার মুলে রয়েছে খুশু খুজুর সাথে, তাওয়াক্কুলের সাথে আমল না করা। এলেম যার থাকে তাকে আলেম বলা যায়, যেমন যার জ্ঞান থাকে জ্ঞানী বলা যায়। কিন্তু সেই জ্ঞান যা বলে সেই অনুযায়ী আমল বা কর্ম না করলে ঐ জ্ঞানের কোন মুল্যই নেই বরং জ্ঞান থেকে সে অনুযায়ী নিজে আমল না করা ও অন্যকে আমল করতে উৎসাহী না করার অপরাধে কাল কেয়ামতের মাঠে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
বাঙালি মুসলমান হিসেবে আরবি ভাষা আমাদের জন্য একটা প্রতিবন্ধকতা এটা প্রকট সত্য। তবে ইহকালিন ও পরকালিন জীবন সুন্দর করার জন্য যে জ্ঞান অত্যাবশ্যকীয় সে জ্ঞান আহরণ না করা বোকামির লক্ষ্মণ।
পেশা জীবনের জন্য আমরা এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্ট, গ্রাফিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স, রোবটিক্স, আইওটি, ব্লকচেইন শেখার জন্য হন্যে হয়ে যাই কিন্তু দিনের শেষের শান্তি সফলতা ও ইহজীবনের শেষের অনন্ত জীবনের অন্তহীন শান্তির জন্য আমরা সে ভাষা, সে জ্ঞান অর্জন করতে বিমুখ অথচ পবিত্র কোরানের প্রথম শব্দ, প্রথম আয়াতেই ছিল জ্ঞান অর্জনের তাগিত। “একরা বে এসমে রব্বেকাললাজি খালাক……” পড়ো সেই প্রভুর নামে যে তোমাকে সৃষ্টি করেছেন…। আমরা জানি কিন্তু পড়ি না।
ফরজ ইবাদতগুলর মধ্যে নামায অন্যতম প্রধান ইবাদত। আমরা সেই নামাজের প্রতি তেমন যত্নবান না। নামাজের বেলায়ও স্পষ্ট ঘোষণা এসেছে, “ ইন্নাস সলাতা তানহা আনেল ফাহসায়ে অনেল মুনকার” নিশ্চয়ই নামায অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে দূরে রাখে।
যখন অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে আমরা দূরে থাকছি না তাহলে দেখতে হবে কোন একটায় গণ্ডগোল আছে। হয় আমার মধ্যে না হয় নামাজে। অবশ্যই আল্লাহ্‌র ঘোষিত বিধান নামাজে সমস্যা না, সমস্যা আমার আমলে। নামায ঠিক হলে সব কিছু ঠিক হয়ে যেতো।
আর একটা কথা, আমরা অনেকেই ভাবি এক দিকে ইবাদত ও অন্য দিকে অপরাধ করে গেলে ব্যাল্যান্স হয়ে যাবে। দুঃখিত, ব্যাপারটা তা না। অন্যায় জেনে সেই অন্যায় করে ইবাদতের দোহাইতে মাফ পাওয়ার কল্পনা করা আল্লাহ্‌র সাথে ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই না।
আমরা সিয়াম বা রোজাতে ছিলাম। রোজা শুধু দৈহিক না। মনোদৈহিক। সাইকো-সোমাটিক। দেহের রোজায় রোজা সম্পূর্ণ হয় না। নফসের রোজা রাখতে হবে। নফসে আম্মারাকে রোজার মাধ্যমে কব্জা করতে পারলে বা বশে আনতে পারার মধ্যেই বাহাদুরি। অন্যথায় অনর্থক উপবাস।
আজ প্রথম রোজায় বিপদে পড়ে এক অফিসে গিয়েছিলাম একটা সমস্যা নিয়ে। সমস্ত কাগজ পত্র ১০০% ঠিক তারপরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাহানা শুরু করলেন। এটা লাগবে ওটা লাগবে। আমি অপলক নেত্রে তার চকচকে আমার চেয়ে লম্বা দাঁড়ির দিকে তাকায়ে মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম।
আরও কি লাগবে তা লিখতে গেলে উনি নিজ হাতে লিখে স্পীডব্রেকার আমার হাতে ধরায়ে দিলেন। আমি বিনয়ের সাথে তার মোবাইল নাম্বার চাইলে তিনি নিখুত ভাবে লিখে দিলেন। আমি তার এসেম মোবারক (নাম) জানতে চাইলে তিনি তাও লিখে দিলেন। এবার তার এজাজত চাইলাম আমি কখন তাকে কল করতে পারি। উনি সুগন্ধিযুক্ত হাসি দিয়ে বল্লেন, ইফতারের পর। (সেই অফিসের একজন বড় সাহেব আমার স্নেহের। তাকে না বলে আমি নিজেই গিয়েছিলাম। এবার তাকে বলা ছাড়া পথ দেখছি না।)
যে আমি সারা জীবন হাজার হাজার মানুষকে সেবা দিয়ে এসেছি, উপার্জনের আগে খেয়াল করেছি এ টাকা হালাল কি না, সেই আমি আজ প্রথম রোজায় আমার সন্তানের বয়সী শ্মশ্রুমণ্ডিত ব্যক্তির অফিস থেকে ইশারা নিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে এলাম, যার বা যাদের বেতন আমাদের টাকায় হয়।
এমন সালাত, সিয়াম বা নামাজ রোজা হলে তো নামাজ কথা রাখবে না, রোজা ওয়াদা পালন করতে বাধ্য না।
নবিজীর মাদানি জীবনের একটা উদাহরণ দিয়ে আজ শেষ করবোঃ
মোহাজেররা মদিনায় এলে নবীজী (সঃ) হযরত আব্দুর রহমান ইবন আওফ (রাঃ) ও হযরত সাআদ ইবন রবি’র মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক গড়ে দেন।
হযরত সাআদ আব্দুর রহমান (রাঃ)-কে বল্লেন, ”আনসারদের মধ্যে আমি সবচেয়ে ধনী। আপনি আমার সম্পদের অর্ধেক গ্রহণ করুন।
আমার দুই জন স্ত্রী আছেন। আপনি তাদেরকে দেখুন। আপনার যাকে পছন্দ হয় আমাকে বলুন আমি তাকে তালাক দেব এবং আপনি তাকে বিবাহ করবেন।”
একদিন তার গায়ে হলুদের চিহ্ন দেখে নবীজী জানতে চাইলে আব্দুর রহমান (রাঃ) বল্লেন, হে আল্লাহ্‌র রসূল আমি বিবাহ করেছি। নবীজী শুনেই প্রথম প্রশ্ন করলেন, মোহরানা কত দিয়েছ?
এমন ছিল রসূলের (সঃ) জামানার মুসলমানের নবীর (সঃ)প্রতি আনুগত্য, আন্তরিকতা ও ত্যাগের নমুনা।
আজ আমরা মসজিদের শহরে বাস করে যে পঙ্কিলতায় ধীরে ধীরে ডুবছি তার শেষ কোথায়?
ইবাদতের অন্তর্নিহিত অর্থ ও দর্শন উপলব্ধি করে যদি আমরা আমাদের দৈনন্দিন ইবাদত করি ও পারিবারিক, সামাজিক জীবনে তার প্রতিফলন ঘটাই তাহলে সেই ইবাদত আমাদের ইহ ও পারলৌকিক জীবনের সুখ, শান্তি ও সফলতার চাবিকাঠি হয়ে উঠবে। ০৩.০৪.২০২২

Categories: Uncategorized

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published.