“অমাল হায়াতুদ্দুনিয়া ইল্লা মাতায়াল গুরুর”- আল কোরান। অর্থাৎ এবং পার্থিব জীবন তো প্রতারণা, ছলনা ছাড়া আর কিছুই না।

কোরানের এই আয়তের তর্জমা তফসির শেষে বাস্তব জীবনে এর প্রায়োগিক দিক আলোচনা করে আরো দুইটা উপদেশ দিয়ে আব্বা আমাকে উচ্চ শিক্ষার জন্য ম্যাট্রিক পাশের পর বাড়ি থেকে হাত ছাড়া করলেন।

কাঁচি দিয়ে দর্জির কাপড় কাটার ভঙ্গিতে আব্বা দেখালেন এভাবে দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করো। তখন আমার বয়সটা আনন্দ ফুর্তি করার দর্শনের গভীরে যাওয়ার না। এমন গভীর দর্শন বোঝার বয়স না। তবে ক্রমোজমাল ইনহ্যারিটেনস ও বক্তার কমুনিকেশান স্কিল এত প্রভাব বিস্তারি ছিল যে তা আমার করোটির গভীরে প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল যা সময়ের সাথে সাথে মহীরুহের মতো শাখা প্রশাখা বিস্তার করে আমাকের দুনিয়া থেকে ছিন্ন করেছে।

দুনিয়ার সমস্ত রকমের প্রলোভন থেকে নিজেকে বিযুক্ত করতে পেরেছি। নিষ্কাম কর্ম করতে পেরেছি। কাজ করে গেছি। জানি নিউটনের তৃতীয় সূত্রের মতো আমার কাজের সমান ও বিপরীতধর্মী কর্মফল আসবেই। আসতে বাধ্য। নইলে জগত মিথ্যা। আমার ভালো কাজের ফল আমি উপভোগ করবো আবার আমার মন্দ কাজের প্রায়াশ্চিত্ত আমাকেই করতে হবে। এর নড়চড় হওয়ার কোন তরীকা বিধির বিধানে নেই।

বাবার দেওয়া তিনটা উপদেশ ছিল আমার পুঁজি যা নিয়ে কারবার করে আজকের আমি।

দ্বিতীয় উপদেশ ছিলঃ “আওলাম ইয়ারাল ইনসানু আন্না খালাকনাহু মেন নুতফাতেন ফাএজা হুয়া খাসিমুম মুবিন” সুরা ইয়াসিন, আয়াত-৭৭ অর্থাৎ মানুষ কি দেখে না যে, আমি তাকে সৃষ্টি করেছি বীর্য থেকে? (অপবিত্র উপাদান, যার স্পর্শে এলে পবিত্র হওয়া ফরজ হয়ে যায়) অতঃপর তখনই সে হয়ে গেলো প্রকাশ্য বিতণ্ডাকারি।

মানুষ অপবিত্র উপাদান থেকে সৃষ্টি (হযরত আদম (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) ছাড়া।) মানুষ কি একবার ভেবে দেখে না যে কি নোংরা উপাদান দিয়ে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? যদি ভাবতো, তাহলে তার মাথা উদ্ধত হতো না। নিজের সৃষ্টি-উপাদান নিয়ে ভাবলেও বিনীত হতো।  

সুতরাং পৃথিবীর পথে চলতে কখনোই মাথা উঁচু করো না। তুমি আমলের মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করতে পারলে মাথা উঁচু করনেওয়ালা তোমার মাথা উঁচু করে দিবেন। নিজেকে কষ্ট করে মাথা উঁচু করে ব্যাথা করে ফেলতে হবে না! আব্বা তখন গীতাঞ্জলী থেকে রেফেরেন্স দিলেনঃ

“আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার তলে,

সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে।“

তৃতীয় উপদেশ ছিলঃ ধানের গাছ দেখেছ? চৈত্রের খরতাপে সবুজ ধান ক্ষেত দখিনা বাতাসে লুটোপুটি খায় কিন্তু যার জন্যে এই ধান গাছের জন্ম সেই ধানের চিহ্নমাত্র সেখানে নাই। এ পর্যায়ে আব্বা রবীন্দ্রনাথ থেকে আওড়ালেন,

“আজি ধানের খেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরির খেলা ও ভাই লুকোচুরির খেলা।“ বল্লেন লুকোচুরি ছাড়া ঐ ক্ষেতে আর কিছুই নেই।

আকাশের বৃষ্টি, শিশির, মাটির রস শুষে নিয়ে ধীরে ধীরে পয়মন্ত হতে ওঠে ধানের ক্ষেত।

এক সময় ধানের শীষের আভাস দেখা যায়। পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে ধানের গাছ। ধীরে ধীরে মাথা নত হয়ে আসে উদ্ধত সেই ধানের গাছে। সবুজ যৌবন মদ-মত্ত দেমাগি গাছের রঙ্গ সোনালী হতে শুরু করে। পরিপক্কতায়, নিজ জন্মের সার্থকতার ফল ধানের শীষের ভার আর বইতে পারে না অহংকারী সেই ধানের গাছ। কৃষককে ধান কেটে সোনার তরীতে তুলতে হয়। না হলে নিজের কামালিয়াতের ওজন বইতে না পেরে মাটিতে লুটায়ে পড়ে। বিলীন হয়ে যায় মাটিতে। এলমে তাসাউফের ভাষায় “ফানা ফিল্লাহ থেকে বাকা বিল্লাহ।“

আব্বা বল্লেনঃ তোমার সত্যিকারের ম্যাচিউরিটি বোঝা যাবে যখন দেখা যাবে যে তোমার জ্ঞান, প্রজ্ঞা, শাণিত চৈতন্য যত তীক্ষ্ণ হবে তোমার মাথা তত নত হতে থাকবে। উদ্ধত মাথা কখনোই প্রকৃত জ্ঞানীর লক্ষ্মণ না। শয়তানের লক্ষ্মণ। কারণ সমস্ত মাখলুকাতের মধ্যে শয়তান ইবলিস হচ্ছে সবচেয়ে জ্ঞানী কিন্তু এলেমের সাথে তার আমলের কোন সম্পর্ক নাই।

এই তিন মন্ত্র মাথায় নিয়ে আমি বাড়ীর বের হয়েছিলাম। কালের ঘাত প্রতিঘাত তিল তিল করে আমাকে শিখিয়েছে ঐ তিন মন্ত্র কত শক্তিশালী ছিল। সৎ পথে থাকা, নিজেকে তৈরি করা, মাথা নত করে মাটির দিকে তাকায়ে মাটির মতো হয়ে চলা সব কিছুই ছিল ঐ মূলমন্ত্রে। আমি শুধু মেনে চলেছি এই যা।

জীবনের এই প্রান্তে এসে মনে হয় ভুল করিনি আমি বরং বাবার দেওয়া উপদেশগুলো শিরোধার্য করে নেওয়ায় সমস্ত দিক দিয়ে এক পরম প্রশান্তিতে ভরে উঠেছে আমার জীবন যার বাইরে দুনিয়ায় আর কিছুই চাইবার থাকে না দীর্ঘ সেজদায় পড়ে থাকা ছাড়া।

“নিত্যকালের উৎসব তব বিশ্বের দীপালিকা
আমি শুধু তারি মাটির প্রদীপ জ্বালাও তাহার শিখা
নির্বাণহীন আলোকদীপ্ত তোমার ইচ্ছাখানি
……………

তেমনি আমার প্রাণের কেন্দ্রে নিশ্বাস দাও পুরে
শূন্য তাহার পূর্ণ করিয়া ধন্য করুক সুরে

বিঘ্ন তাহার পুণ্য করুক তব দক্ষিণপাণি
অরূপ তোমার বাণী
অঙ্গে আমার চিত্তে আমার মুক্তি দিক সে আনি।“-রবীন্দ্রনাথ

Categories: Uncategorized

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published.