কল্পনা করুন আপনার ৯ বৎসরের বাচ্চাটা রাতের অন্ধকারে প্রাণভয়ে গাছে চড়ে ডালের উপর বসে পাখ-পাখালী, কীট-পতঙ্গের সাথে সারা রাত কাটায়ে দিল, কেমন লাগবে?

একঃ

স্বাদেশি আন্দোলনের সময় নজরুল লিখেছিলেন,

” ক্ষুধিত শিশু চায় না স্বরাজ,

চায় এক মুঠো ভাত একটু নুন”

তেমনই আমাদের অত্যাচারিত, নিগৃহীত, নিপীড়িত সনাতন ধর্মাবলম্বীরা “ধর্মনিরপেক্ষ”, “অসম্প্রদায়িক”, “বৈষম্যহীন” “পরমতসহিষ্ণু” ইত্যাদি রসগল্লার নাহাল টকশো’র মতো কথাগুলো শুনতে চায় না। তাঁরা চায় একটু নিরাপত্তা, জন্ম ভিটায় প্রকৃতির কোলে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে, সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে।

আজ থেকে প্রায় ৭৫ বৎসর আগের এই অক্টোবার মাসে গান্ধীজী পায়ে হেটে এসেছিলেন অখণ্ড বাংলার এই অংশে।

কোলকাতার দাঙ্গায় প্রথম ৭২ ঘণ্টায় ৪০০০ হিন্দু-মুসলমান নিহত হন। তারই রেশ ধরে আমাদের দেশের দাঙ্গা। গান্ধীজী আমাদের দেশের দাঙ্গাক্রান্ত স্থানে পৌঁছানোর পর ১১৬ মাইল পথ পায়ে হেটে হেটে ৪৭ টা বিধ্বস্ত গ্রাম দেখতে গিয়েছিলেন। উভয় পক্ষের সাথে বসেছিলেন। প্রার্থনা সভা করেছিলেন।

আবার আমাদের দেশের দাঙ্গার রেশ ধরে বিহারের দাঙ্গা। ৩ মাস থেকে গান্ধীজী ১৯৪৭ সালের ২রা মার্চ বিহারে চলে যান।

আজকের প্রথম আলো’র সংবাদ অনুযায়ী রংপুরের পীরগঞ্জে যে নারকীয় ঘটনা হয়েছে তার মধ্যে এক বাড়িতে যেয়ে “দুই যুবতী মেয়ে” কোথায় জানতে চাওয়া হয়েছে। প্রাণ ভয়ে ঘর ছেড়ে মাঠে লুকানো থেকে শুরু করে আরো অনেক সংবাদ পেপার পত্রিকায় ভাসছে।

আমার এ লেখার উদ্দেশ্য এই ৭৫ বৎসরেও আমরা মানবিক হতে পারলাম না? সংখ্যালঘূদেরকে ইসলামের অনুশাসন অনুসারে অভয় দিতে পারলাম না?  (কোরান, হাদিসের অসংখ্য রেফারেন্স দেওয়া যাবে। আপনারাও জানেন। আমি এ লেখার দ্বিতীয় অংশে তা লিখেছি কিছুটা। প্রয়োজন বোধ করলে আপনি পড়ে দেখতে পারেন।)

কুমিল্লায় যা হয়েছে তা তদন্তাধিন। প্রশাসন এটা দেখবে। এটা কোন কারোই সুক্ষ্ম পরিকল্পনা  হতে পারে না। বিষয়টা স্পর্শকাতর সন্দেহ নাই কিন্তু প্রমাণ ছাড়া এর প্রতিবিধানে নেমে যাওয়ার বিধান কোথায় আছে? ইসলামতো ভিন্ন ধর্মানুসারীদেরকে প্রটেকশান দেওয়ার জন্যে আদেশ করেছে।

তার জন্য এ দেশের নানা প্রান্তের প্রান্তিক মানুষের উপর যে অমানবিক অত্যাচার হোল তা কোন ধর্মীয় কেতাব দিয়ে হালাল করা যাবে? যে গরু ছাগল গুলো লুট করা হোল তা কি মহান আল্লাহ্‌র নামে জবাই করলে হালাল হয়ে যাবে? যে বাচ্চাটা মায়ের সাথে অন্ধকার রাতে আক্রান্ত বাড়ির পাশের ক্ষেতে লুকায়ে ছিল তার মানসিক ট্রমা কি সারা জীবনে যাবে? ৯ বৎসরের যে শিশুটা ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে গাছের ডালে উঠে সারা রাত কাঁটালো তার বাকি জীবন থেকে কি আমরা এই ভয়াল স্মৃতি মুছে দিতে পারবো?

একবার চোখ বন্ধ করুন। কল্পনা করুন আপনার ৯ বৎসরের বাচ্চাটা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে মা-বাবা ছাড়া রাতের অন্ধকারে প্রাণভয়ে গাছে চড়ে ডালের উপর বসে পাখ-পাখালী, কীট-পতঙ্গের সাথে  সারা রাত কাটায়ে দিল? কেমন লাগবে? পথ শিশুদের দেখে, বাজারের ঝাকা মাথায় পিচ্চি মিনতি দেখলে যদি আপনার মনে কোন বিকার না হয় তাহলে ধরে নিতে হবে আপনি মানুষ্য পদবাচ্য না। এ লেখা আপনার জন্য না।  

সব কিছু হারালো যারা  তারা খাবে কি? থাকবে কোথায়? কতদিনে আবার সাজানো সংসার নতুন করে সাজাবে? সুযোগ হলেও তারা কি সেই উদ্যমে নির্ভয়ে জীবন শুরু করতে পারবে?

আমার একটাই প্রস্নঃ প্রথমত, ইউটিউবে যে শত শত ওয়াজকারীর কত কত রকমের ওয়াজ ঢেউ খেলে যায় তারা সবাই যদি সমস্বরে এর প্রতিবাদ করতেন তাহলে আমরা আশান্বিত হতে পারতাম।  তাদের কি এ বিষয়ে কিছুই বলার নেই? “কিছু কি বলার ছিল না?”  যদিও সামান্য কয়েকজনকে দেখা গিয়েছে তা ‘সিন্ধুতে বিন্দুসম’।  

দ্বিতীয়ত, যারা সমাজকর্মী, সমাজ নিয়ে ভাবেন, টেলিভিশনে ভীষণ ভারী ভারী বক্তৃতা দেন, তারা যদি সবাই একত্র হয়ে উচ্চকণ্ঠে এর প্রতিবাদ করতেন তাহলে সমাজ একটা ম্যাসেজ পেত। এ ছাড়া অন্যান্য যারা সমাজের মাথায় তারা যদি প্রতিবাদে ফেটে পড়তেন তাহলে তারা সাথে পেতেন অসংখ্য অনুসারী। কারণ দুর্বৃত্তরা সংখায় সামান্যই হয়ে থাকে। দুর্বৃত্তদের জন্যে আজ একজন বাবা, মা,ভাই, বোন, এমনকি গরু ছাগল, বৃক্ষলতাও তাদের হাত থেকে রেহাই পায় নি।       

( ইসলামতো বৃক্ষ নিধনের ব্যপারেও সাবধানতা অবলম্বন করতে বলেছে। পশুদের ‘হক’ আদায়ে তাগিদ দিয়েছে!!)

গান্ধীজীর সেই অমানবিক কষ্ট করে পায়ে হেটে আসা আর অসহনীয় অপমানের পৌণে একশত বৎসর পরও আমরা মানবিক হতে পারলাম না! আমরা ‘কুওত’ দেখাতে কার্পণ্য করলাম না!

সারা পৃথিবী কি ম্যাসেজ পেল? লালমনিরহাট সহ সারা বাংলাদেশে কত শত সম্প্রীতির উদাহরণ আছে তা ক্ষণে ক্ষণে আমাদেরকে মুছে দিতে হবে?

আমার দুনিয়া-ত্যাগী সূফী বাবার সর্বক্ষণের সঙ্গী নন্দ কাকাকে আজো ভুলতে পারি না।

আমার হাতে গোণা সত্যিকারের যে দুই একজন বন্ধু আছে তাদের সংখ্যাগুরুই হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বী, যারা জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মনীষায় উজ্জ্বল এক একটা নক্ষত্র। যে কোন প্রয়োজনে আমি প্রফেসর ডাক্তার কে সি গাঙ্গুলীকে স্মরণ করি। তাঁর পুরো পরিবারই আমার বন্ধু। ছেলে শৌভিক যেমন, তেমনই কানাডা প্রবাসী বৌমা তপা, আমিও যার আর একটা বাবার পর্যায়ের যে দূর দেশ থেকে প্রয়োজনে আমাকে নক করে।

ডক্টর চন্দ্র শেখর বালা, নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ, আমার অনেক ব্যক্তিগত, পারিবারিক সহ নানা পরামর্শের সারথি। বাংলার প্রফেসর ও রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী বিমল চক্রবর্তী ইত্যাদি।

মহালয়া থেকে শুরু করে বিজয়া দশমী পর্যন্ত দুর্গাপূজার গভীর দর্শন নিয়ে আমি যে লেখাগুলো  শার্পনারের  ওয়েবসাইটে লিখেছিলাম তা দেখে এপার-ওপার বাংলার অনেক সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রশংসা করে বলেছেন, একজন মুসলিম কি করে আমাদের ধর্মের এত গভীর দর্শন নিয়ে লিখতে পারে! লেখাগুলোকে একত্রিত করে একটা পুস্তিকা প্রকাশের অনুরোধ করেছেন অনেকে কারণ সাধারণ মানুষ শুধু দুর্গাপূজাই জানে কিন্তু এর দর্শন খুব কমই বোঝেন।    

যন্ত্রণাদগ্ধ নজরুল লিখলেন,

“জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াত করছে জুয়া,

ছুলেই তো জাত যাবে, জাত ছেলের হাতের নয়ত মোয়া।“

“ইহারা ধর্ম-মাতাল। ইহারা সত্যের আলো পান করে নাই। শাস্ত্রের এলকোহল পান করেছে।“-নজরুল ইসলাম।

মাত্রার বেশী এলকোহল বা মদ পান করলে যেমন মাতালের পরিণতি অবধারিত মৃত্যু, তেমনই ধর্ম নিয়ে যারা বাড়াবাড়ি করে সেই সব ‘ধর্ম-মাতাল’ এর করুণ পরিণতির কথা বলেছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যাকে আমাদের আর এক কবি এক সময় ‘মুসলমান কবি’ বানানোর জন্য নজরুলের কবিতায় কাঁচি চালাতে উদ্যত হয়েছিলেন। কারণ? তাঁর কবিতায় অনেক উপমা উৎপ্রেক্ষা ভারতীয় পুরাণ থেকে নেওয়া!

জানিনা উনি ইংরেজি সাহিত্য পড়েছিলেন কি না তাহলে বুঝতেন, কোন দূরে ইংল্যান্ড আর কত দূরে গ্রীক-রোম কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যের পাতায় কত গ্রীক পুরানের উপমা!!

নজরুল বলছেন, একদিন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সাথে আলোচনা হচ্ছিলো আমার, হিন্দু-মুসলমান সামস্যা নিয়ে। গুরুদেব বল্লেন,” দেখ, যে ন্যাজ (পশুর লেজ)বাইরের, তাকে কাঁটা যায়, কিন্তু ভিতরের ন্যাজকে কাটবে কে?” … এ ন্যাজ গজালো কি করে?এর আদি উদ্ভব কোথায়?ওই সঙ্গে এটাও মনে হয়, ন্যাজ যাদেরই গজায়-তা ভিতরেই হোক আর বাইরেই হোক-তারাই হয়ে ওঠে পশু।  

“অবতার পয়গম্বার কেউ বলেন নি, আমি হিন্দুর জন্য এসেছি, আমি মুসলমানের জন্য এসেছি। আমি খ্রিষ্টানের জন্য এসেছি। তাঁরা বলেছেন, আমরা মানুষের জন্য এসেছি- আলোর মতো, সকলের জন্য।

দুইঃ

সুরা আনআমে’র ১০৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্‌ বলেন তোমরা ভিন্নধর্মীদেরকে গালি দিয়ো না তাহলে তারাও তোমার আল্লাকে যেন গালি দিয়ে না বসে।

(আমি অবাক হই এই ভেবে যে এই বৈচিত্র্যতো স্রষ্টার সৃষ্টি করা। সেই মহা ক্ষমতাধর আল্লাহ্‌ চাইলে সবাইকে একই চেহারার, একই মানসিকতার, একই অর্থবিত্তয়ালা, একই ধর্মানুসারী করতে পারতেন। তিনি যা করেন নাই তা করার জন্য অন্যরা কেন মরিয়া? তিনি যা করেন নাই তা করার জন্য অন্যরা কেন ধর্ষণ পর্যন্ত করতে পিছপা হয় না!)    

আমি আমার ধর্ম নিষ্ঠার সাথে পালন করবো। অন্যের কাছে দৃষ্টান্ত, অনুকরণীয় হবো। এতে যদি কেউ কারো ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তা গ্রহণ করে সেটা সম্পূর্ণরুপে তার ব্যাক্তিগত ব্যাপার। জবরদস্তিকে কোন ধর্মই স্বাগতম জানায় না। এ ব্যপারে কোরাণে সুন্দর শব্দ দিয়ে প্রকাশ আছে, ”উদউ ইলা সাবিলে রব্বিকা বেল হেকমাতে” অর্থাৎ হেকমতের সাথে তোমার রবের প্রতি আহ্বান করো।

কোরাণে মানুষকে প্রথমিকভাবে দুই প্রকারে সম্বোধন করা হয়েছেঃ ১) ইয়া ইয়্যুহান্নাস অর্থাৎ হে মানবমণ্ডলী। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলা। ২) ইয়া ইয়্যুহাল্লাজিনা আমানু অর্থাৎ হে ইমানদারগণ! (শাব্দিক অর্থে দাঁড়ায়,’ হে যাহারা তোমরা ঈমান এনেছ)

নবীকে উদ্দেশ্য করেও বলা হয়েছে, “ওমা আরসালনাকা ইল্লা রহাতাল্লিল আলামিন” এবং আপনাকে সমগ্র বিশ্ব জগতের রহমত স্বরূপ প্রেরণ করা হয়েছে। সেই রহমতের নবীর অনুসারীদের কর্মকাণ্ডের নমুনা আমরা আজ দেখছি!!!! ইসলামতো ভিন্ন ধর্মানুসারীদেরকে প্রটেকশান দেওয়ার জন্যে আদেশ করেছে। গায়ে হাত দিতে বলে নি! মদীনায় হিজরতের পর ইহুদী-খ্রিস্টানদের সাথে নবীজির আচরণের অনেক উদাহরণ থেকে আমাদের শেখার আছে।

ইবলিসের পতনের একমাত্র কারণ অহংকার। আব্রাহামিক ধর্মের প্রথম ধর্ম ইহুদী ধর্মের পতনের অন্যতম কারণ অহংকার। আমাদের মুসলমানদের কার্যাবলী দেখে মনে হচ্ছে আমরা কেউই এর সুন্দর সংরক্ষণ চাই না।

ময়ূরের সৌন্দর্য জঙ্গলে বেমানান। তাকে লোকালয়ে এসে সুন্দরের প্রশংসা নিতে হয়। নিজ সৌন্দর্য দেখে ময়ুর যদি দেমাগী  হয় তাহলে তাকে একবার নিজের পায়ের দিকে তাকাতে হবে। ওই সুন্দর ময়ূরের কুৎসিত পা তার সব কিছু শেষ করে দিতে পারে। আমরা কি একবার নতমুখী হয়ে ময়ূরাক্ষী পায়ের দিকে তাকাবো না? নাকি প্রলয় দিবসের আলামত তালাশ করেই দিন গুজরান করবো?   

তব ভুবনে, তব ভবনে

মোরে আরো আরো আরো দাও স্থান।

আরো আলো, আরো আলো,

এই নয়নে, প্রভু ঢালো

সুরে সুরে বাঁশী পুরে

তুমি আরো আরো আরো দাও তান।

…………………………………

প্রাণ ভরিয়ে, তৃষা হরিয়ে

মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ। “

Leave a Reply