প্রাচুর্য পাপাচার শেখায় ও প্রভুকে ভুলায়ে দেয়। অধিকাংশ সম্পদশালী লোক পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেয়।

সরাসরি ক্লাস সিক্সে ভর্তি হওয়ার জন্য ম্যাট্রিক পাশের পর বাড়ি ছাড়ার সময়  অনূর্ধ্ব পঞ্চদশ  ক্ষীণকায়, খর্বাকৃতির আমাকে বাবা কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। যা আজো আমি পালন করি। মানুষকে পর্যবেক্ষণ করি আর একা একা হাসি।

প্রথম উপদেশ ছিলঃ কেউ হেসে কথা বল্লে মনে করো, তার কোন মতলব আছে। তাকে পরীক্ষা করে নিও। কিন্তু কেউ রাগ করে, মুখ কালো করে কথা বল্লে মনে করো যে সে তোমার মঙ্গল চায় বলেই এমন করেছে তাই তার কথায় মন খারাপ করো না। জীবনে “মুখ কালো করে কথা বলা লোক” কমই পেয়েছি। (নির্মল হাসি এর আওতাধীন না!)

দ্বিতীয় উপদেশ ছিলঃ

বাবাঃ চৈত্রের ধান গাছ দেখেছ?

আমিঃ জি।

বাবাঃ দেখো যে কারণে ধান গাছের জন্ম চৈত্রে তার কোন আলামত নাই। কিন্তু উদ্ধত সবুজ ধান গাছ দেমাগে অটল। বাবা রবীন্দ্রনাথ থেকে উচ্চারণ  করলেন,” আজি ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরির খেলা ও ভাই লুকোচুরির খেলা।“ ধান খেত ভরা শুধু লুকোচুরির খেলা ছাড়া আর কিছুই নেই।

এর পর ধীরে ধীরে মাটি থেকে, রাতের শিশির থেকে সার সংগ্রহ করে, জীবনীশক্তি নিয়ে পুষ্ট হতে থাকে ধান গাছ। পরিপূর্ণতার দিকে এগুনো ধান গাছের মাথা ধানের শিষের ভারে নুইয়ে আসে। বাবা আবারো গীতাঞ্জলিতে এলেন, ”আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার তলে, সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে………”

জীবনের সফলতার দিকে এগুনো ধান গাছ এবার ধীরে ধীরে সবুজ থেকে সোনালি হতে শুরু করে। চাষি  যদি উপযুক্ত সময়ে ধান কেটে না নেয় তাহলে সফলতায় পরিপূর্ণ ধানগাছ সার্থকতার ভারে নুইয়ে পড়ে মাটিতে। বাবা বল্লেন, “তখনকার অবস্থা আত্ম-বিসর্জনের পরম পথে ‘ফানা ফিল্লাহ’ থেকে ‘বাকা বিল্লায়’ পৌঁছে যাওয়ার মতো। সুতরাং মাথা উদ্ধত করো না জীবনে। মাথা নত করো। বলেই সুরা ইয়াসিন থেকে উচ্চারণ  করলেন,” আও অলাম ইয়ারাল ইনসানু আন্না খালাকনাহু মেন নুতফাতেন………। (আয়াত ৭৭) অর্থাৎ মানুষ কি দেখে না (চিন্তা করে না) যে, আমি তাকে সৃষ্টি করেছি সামান্য বীর্য থেকে। (নাপাক বস্তু থেকে)  এখান থেকে বাবার উপদেশ, “সুতরাং তুমি মাথা নত করো, উদ্ধত করো না। মাথা উঁচু করে দেনেওয়ালা তোমার মাথা উঁচু করে দেবেন যদি তুমি তাঁর পথে থাকো।“

বাবার দেওয়া আরও কিছু উপদেশ সম্বল করে পৃথিবীর পথে পা ফেললাম। মাথা নত। এপর্যন্ত চলার পথে ভুল করিনি তা বলব না, তবে চেষ্টা করেছি স্রষ্টার পথে থাকতে। এবং সেই মহান স্রষ্টাই আমার মাথা তুলে ধরেছেন উপরে।

এখনও মাথা নত করে চলি। অনেক “হিডেন-এজেণ্ডা” র, মোনাফেকি, ধান্দাবাজ হাসি দেখি আর বাবার কথা মনে পড়ে। বাবা উপদেশ দিতে দিতে নানা উদাহরণের মধ্যে নজরুলের প্রেমের কবিতাও নিয়ে আসতেন।

“আসবে আবার আশিন হাওয়া শিশির ছেঁচা রাত্রি,

থাকবে সবাই, থাকবে না এই মরণ পথের যাত্রীই।“  কাজী নজরুল ইসলাম।

বাবা গত হয়েছেন কিন্তু তাঁর দেওয়া উপদেশ গুলো মনি-মুক্তার মতো আমার হৃদয়ের গহীনে সক্রিয় আছে। পথ চলতে চলতে নানা পরিস্থিতিতে সম্মুখের পথিককে বাবার দেওয়া উপদেশের আলোকে যাচাই করে নেই।

বাবার শেখানো “মুখ কালো করে শাসন করা মানুষ” আজো খুব একটা খুঁজে পাই নি। কদাচিৎ কাউকে পেলে কোহিনূর মণি’র মতো মনে করে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছি কিন্তু কিছু পথ এক সাথে হেটে মনে হয়েছে “সম্পূর্ণ-সমর্পণ-করা-মানুষ” পাওয়া কঠিন।

“কারে তুমি দিতে চাও ফাঁকি

মোর বুকে জাগিছেন অহরহ সত্য ভগবান।“  নজরুল

সীমাহীন লোভ আর লালসা আমাদেরকে নিঃসঙ্গ করতে করতে, নিষ্ঠুর করতে করতে এমন এক দেয়ালে পিঠ ঠেকায়ে ফেলেছে যে আমরা ভুলে গেছি আমরা এই জগতে কিছুদিনের অতিথি। এখানে জঞ্জাল জড় করলে যাত্রা পথ ও মঞ্জিল উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এই ভোগবাদ আমাদেরকে প্রাচুর্যের পথে হাতছানি দিয়েই চলছে আর আমরা ভেড়ার পালের মতো, সার্কাসের জানোয়ারের মতো গতানুগতায় অবগাহন করে চলছি।

“প্রাচুর্য পাপাচার শেখায় ও প্রভুকে ভুলায়ে দেয়। অধিকাংশ সম্পদশালী লোক পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেয়।“

যে নেয়ামত কয়েদি বানায় আর যাকে নেয়ামত কয়েদি বানায় তাদের ছাড়ো। নেয়ামত যাচাই করে নাও যে তা কি রহমত না অভিশাপ?

শুদ্ধতমের সাধনায় নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে বর্তমান পৃথিবীর সমস্ত অবাঞ্ছিত দুঃখ যন্ত্রণা থেকে নিজেকে হেফাজত করা সম্ভব। তবে সে পথ অনেক বন্ধুর। সাগর পাড়ের পরিপুষ্ট নারকেল আপনি ঝরে পড়ে ভাসতে ভাসতে কোন অসীমের কোন সাগর কুলে যেয়ে যে আবার নতুন জীবন শুরু করবে তা কেউ বলতে পারে না। নারকেলের পূর্ণ হয়ে ওঠাই তাকে এত সাহসী, এত নিঃশঙ্ক, এত দুঃসাহসী করেছে। ডাব হয়ে কচি কৌলীন্যে কেলানো যেতে পারে তবে মহাপৃথিবীর পথে বেশিদুর এগুনো যায় না।

মহাত্মা গান্ধী জীবনের শেষ স্নান একাই করেছিলেন যদিও তাঁর নাতনী একাজটা করায়ে দিতেন। ওইদিন সকালে রাজীব গান্ধী দেখা করতে এসে গান্ধির পায়ের কাছে কিছু ফুল রেখেছিলেন। দেখে গান্ধী বল্লেন যে এটাতো মরা মানুষকে দিতে হয়। হয়ত তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ইঙ্গিত দিয়েছিল তাঁর জীবনাবসানের।

নাতনী যখন অভিমান করে বলল কেন গান্ধী একা স্নান করলো উত্তরে গান্ধী রবীন্দ্রনাথ থেকে উত্তর দিলেনঃ

“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে……” সেই দিনই ছিল গান্ধীর জীবনের শেষ দিন।

এই সামান্য কিছু দিনের জন্য আসা পৃথিবীতে যদি কোন সত্যিকারের বন্ধু পাওয়া যায় তাহলে তাকে হারানো উচিৎ হবে না। এদের সংখ্যা নেহায়েতই সামান্য। বাবার শেখানো উপদেশাবলি নিয়ে আজো খুঁজে ফিরি সেই মানুষ। আবারো নজরুলঃ

“আমি যুগ যুগ ধরি লোকে লোকে মোর প্রভুরে খুঁজিয়া বেড়াই।“

এই প্রভুর পথ  কণ্টকাকীর্ণ, বন্ধুর। জহুরীর মতো পরশপাথর যাচাই করে নিতে হবে। নইলে হোঁচট খাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। প্রয়োজন শেখ সাদির সেই, “মান তু শুদাম, তু মান শু দি…………। ‘র মতো “আমি তুমি আর তুমি আমি হয়ে যাওয়া” সেই অবর্ণনীয় অবস্থান যার সন্ধান রুমি পেয়েছিলেন শামস ই তাবরিজকে পেয়ে। যুগে যুগে এমন মনিষীরা আমাদেরকে শেখায়ে গেছেন ভোগবাদ থেকে নিজেকে সযত্নে সরায়ে কিভাবে আধাত্ম জগতের অনাবিল আনন্দের জগতে বিচরণ করা যায়।

বাবার শেখানো পথ ধরে আজো চলছি আমি। এখনও বিশ্বাস করি তেমন মানুষের সন্ধান পেয়ে যাবো একদিন, অন্তিমের আগের কোন একদিন।

Leave a Reply