বই পড়া ।

‘কিণ্ডল’ এবং ‘ই-বুক’ ধুমকেতুর মতো এসে প্রলয় ঘটাতে চাইলেও সে ঢেউ এখন বিনীত প্রত্যাবর্তনের পথে।  

শরীরের সুস্থ রাখার জন্য যেমন ব্যায়াম, মনের জন্য তেমনি বই পড়া। এটা প্রমাণিত ঐতিহাসিক সত্য।

“Whenever you read a good book, somewhere in the world a door opens to allow in more light.”

অর্থাৎ, তুমি যখন একটা ভালো বই পড়ো সে বই তোমার মনের জগতের যে কোন যায়গায় আলোকের ঝরনাধারার স্তব্ধ অর্গলদ্বার খুলে দেয়। “আরো আলো, আরো আলো, এই নয়নে প্রভু ঢালো । সুরে সুরে বাঁশী পুরে তুমি আরো আরো আরো দাও তান।“  

রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী একবার দুঃখ করে লিখেছিলেন, এক বাড়িতে বিশ্রামের সময় একটা বই চাইলে বাড়ির কর্তা অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটা পঞ্জিকা তাঁর হাতে তুলে দেন!

বিশ্ববিখ্যাত ফ্রাঙ্কফুর্ট বই মেলায় বইয়ের সাগরের মাঝেও নাকি “বুককভার” বিক্রি হতো।  বুককভার অর্থাৎ ফাঁকা বাক্স যা দেখতে অবিকল উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, সমারসেট মম, জে বি শ, বা কল্পনা করতে পারি  বঙ্কিম, রবীন্দ্র, নজরুল, শরৎরচনাবলীর বুককভার! যার মধ্যে কোন বই নেই। দেখলে মনে হবে কোন পণ্ডিতের বাড়ি!

বই নিয়ে এই ভণ্ডামির পিছনে এক ধ্রুব সত্য উজ্জ্বল হয়ে উঁকি দিচ্ছে। তা হলোঃ মানুষের রুচি, সংস্কৃতি, সভ্যতা, আভিজাত্য শাণিত করতে বইয়ের চেয়ে ভালো কিছু  আর নেই!

পোশাক, অলঙ্কার, গ্যাজেট, গাড়ী তাৎক্ষণিকভাবে অন্যকে প্রভাবিত বা মোহিত করার উপকরণ যা একটা নিদিষ্ট সময় পরে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বইয়ের জ্ঞান পলির মতো জমতে জমতে একটা মানুষকে জ্ঞানী, প্রাজ্ঞ, রুচিশীল, বিবেকবান ও সত্যশ্রয়ি হিসেবে গড়ে তোলে।       

কোরানের নাজিলকৃত প্রথম শব্দ হচ্ছে “ইকরা” পাঠ করো। আরবি ব্যাকারন অনুযায়ী এটাকে ‘আমর’-এর ছিগা বলে। আদেশ মূলক বাক্য বা ইম্প্যারেটিভ মুড। সে আদেশ থেকে অবশ্য আমরা অনেক আগেই নিরাপদ দূরে সরে গেছি!

বই মানুষকে স্থিতধী করে, মনকে প্রশান্ত করে মানসিক চাপ কমায়, শব্দ ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে, স্মৃতিশক্তি উন্নত করে, অজানাকে সহজে জানায়, অ্যানালাইটিকাল ক্যাপাবিলিটি শাণিত করে, কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতা বাড়ায়, মনোযোগ শক্তি বাড়ায়, এটা আত্মার ধ্যান দীর্ঘস্থায়ী করে, আত্মউন্নয়নে সহায়তা করে।

পেশাজীবীদের মধ্যে যারা অতিমাত্রায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী তাদের জন্যে তো বই পড়ার বিকল্প আজো সৃষ্টি হয় নাই।

ইদানীং দুনিয়ায় আর এক ভণ্ডামির কালচার শুরু হয়েছে। ৮-১০ টা মলাট ছাড়া বই  রশি দিয়ে একসাথে গিট দিয়ে বান্ডিলের মতো করে সাজায়ে রাখা হচ্ছে। দেখলে মনে হতে পারে অনেক অনেক পুরনো বই, উই পোকায় কাটার মতো দেখতে। এটা নাকি একটা “এনটিক” “এনটিক” আবহ দেবে যা শৌখিন পয়সাওয়ালাদের মানসম্ভ্রম আরও বাড়াবে।ড্রইং রুমে আতর-সুবাস মাখানো কৃত্রিম ফুলের মতো পুরনো বইয়ের সাঁজ পূর্ব পুরুষের থেকে উত্তরাধিকার মনে করে অতিথি অভ্যাগতরা সম্ভ্রমের নজরে দেখবেন গৃহকর্তাকে!!     

এখানেও বই না পড়ে বইয়ের সাহায্য নিয়ে আভিজাত্য বাড়ানোর এক ধুরন্ধর ভণ্ডামি যা অলখে প্রচার করছে যে বই হচ্ছে মানুষের মর্যাদা বাড়ানোর ‘উত্তম মাধ্যম’ (প্রহার না!!)।

আমেরিকার বিখ্যাত পণ্ডিত, দার্শনিক, Ralph Waldo Emerson, যাকে আমেরিকানরা “Man of letters in America” নামে ভূষিত করেছে, তিনি চমৎকার বলেছেনঃ

“If we encounter a man of rare intellect, we should ask him what books he reads.”

অর্থাৎ, আমরা যদি অসাধারণ ধীশক্তি সম্পন্ন কোন মানুষকে দেখি তাহলে আমরা যেন তাকে জিজ্ঞেস করি, তিনি কোন ধরনের বইগুলো পড়ে থাকেন।

আমাদের দেশের ছেলে মেয়েরাও বিল গেটস, ওরেন বাফেট, সত্য নাদেলা সহ সফল সম্পদশালী ও শীর্ষ কর্মকর্তারা কি কি বই পড়েন তার খোঁজ খবর রাখেন। কেউ কেউ এগুলো পড়েও থাকেন। তবে এই পড়া বিশেষ কোন উদ্দেশ্য মাথায় রেখে পড়া হয় যা একজন মানুষের মনের সামগ্রিক বিকাশে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না বা অবদান রাখতে পারে না।  

আমার বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে শেষ করিঃ দাওয়াতে যেয়ে সপরিবারে অপেক্ষমাণ আমরা। গৃহকর্তা সবাইকে নিয়ে তখনও বাইরে। বসে থেকে থেকে বিরক্ত আমি বাসার কাজের মানুষটাকে বললাম যদি কোন বই আমাকে দিতে পারে। (উল্লেখ্য, ড্রইং রুমে কোন নতুন, পুরাতন পত্রিকাও ছিল না।)

অনেক খোঁজা খুঁজির পর তিনি আমার হাতে একটা মিনি সাইজের বই এনে দিলেন। বইটা ছিল “হকিনস”-এর প্রেশার কুকারের ক্যাটালগ!!!

আমার সমস্ত বিরক্তি, অবসাদ এক ক্যাটালগেই উধাও।

Categories: Uncategorized

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published.